বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনাকাটার নামে গোপনে ভুয়া বিল, ভাউচার তৈরি করে ও একই নাম্বারের একাধিক বিল তৈরি করে বারবার দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করেছেন টাঙ্গাইল সদর উপজেলার গোসাই জোয়াইর আজিম মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও শিক্ষক সুবীর চন্দ্র রায়। এছাড়া বিজ্ঞানাগারে যন্ত্রপাতি কেনার জন্য সরকারি বরাদ্ধের ১ লাখ টাকার পুরোটাই আত্মসাত করেছেন প্রধান শিক্ষক মামুন।
ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সুবীর চন্দ্র রায়ের বিদ্যালয়ের কোষাগার হতে ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে ভুয়া বিল ও ভাউচার দেখিয়ে এসব অর্থ আত্মসাতের বেশকিছু প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এর মধ্যে
২০২২-২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের হিসাব রক্ষকের (ক্যাসিয়ার) দায়িত্ব পালনকালে পরীক্ষার কাগজ ও প্রশ্নপত্র কেনার নামে টাঙ্গাইল উপজেলা শিক্ষক সমিতির ১৮৪ নাম্বারের ৪টি ভুয়া বিল তৈরি করে বিদ্যালয় তহবিল থেকে মোট ৮৬,৭০০ টাকা আত্মসাত করেন প্রধান শিক্ষক মামুন। এর মধ্যে-মার্চ মাসে ১৮৪ নাম্বার বিলে-১৮৩০০ টাকা, জুন মাসে ১৮৪ নাম্বার বিলে-২৪,৭০০ টাকা, সেপ্টেম্বরে ১৮৪ নাম্বার বিলে-২৪,৭০০ টাকা এবং অক্টোবর মাসে- ১৮৪ নাম্বার বিল দেখিয়ে -১৯,০০০ টাকা উত্তোলন করেন।
এবিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইল উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাবেক সেক্রেটারি শামীম আল মামুন বলেন, “একই নাম্বারের একাধিক বিল করার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি বিল বইয়ের প্রতি পৃষ্ঠায় পৃথক পৃথক বিল নাম্বার থাকে। যদি কেউ একই বিল নাম্বারসহ একাধিক বিল জমা দিয়ে থাকেন তবে বুঝতে হবে এগুলা ভুয়া বা ফেক বিল। ভুয়া বিল তৈরি করে কেউ প্রতারণার সুযোগ নিলে এর দায় দায়িত্ব তার, আমাদের সমিতির না।”
একইভাবে পরীক্ষার কাগজ ক্রয় দেখিয়ে উপজেলা শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টের নামে ভুয়া বিল তৈরি করে ৮৮০ নাম্বারের ৩টি ভুয়া বিল তৈরি করে বিদ্যালয় তহবিল হতে মোট ৬১, ০০০ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাত করেন প্রধান শিক্ষক মামুন। এরমধ্যে ২০২২ সালের মার্চ মাসে ৮৮০ নাম্বার বিলে-১০, ০০০ টাকা, ৮৮০ নাম্বার বিলে জুন মাসে-২৫, ০০০ টাকা এবং অক্টোবর মাসে ৮৮০ নাম্বার বিলে-২৬, ০০০ টাকা উত্তোলন করেন শিক্ষক মামুন।
এবিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টের বর্তমান সেক্রেটারি জাহাঙ্গীর বলেন, বিষয়টি দেখে জানাতে হবে। এর ২দিন পরে তিনি ২০২২-২৩ সালে আজিম মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের কাগজ ক্রয়ের কয়েকটি বিল পাঠান। কিন্তু প্রতিবেদকের হাতে আসা প্রধান শিক্ষক মামুনের দাখিল করা বিলের সঙ্গে যাচাই বাছাই করে তার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। যাচাইয়ের পর, জাহাঙ্গীরের পাঠানো বিলগুলো উপজেলা শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টের লোগো, ঠিকানা ব্যবহার করে নতুন করে কম্পিউটারে তৈরি করে কালার প্রিন্ট করা বলে প্রতীয়মান হয়।
এখানেই শেষ হয়নি প্রধান শিক্ষক মামুনের দুর্নীতির চিত্র। ২০২২-২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানাগারের জন্য যন্ত্রপাতি কিনতে ১ লাখ টাকার অনুদান দেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু যন্ত্রপাতি না কিনে ‘মেসার্স শাহরিয়ারস’ নামে ঢাকার টিকাটুলির টিকানাযুক্ত একটি কম্পিউটারের দোকানের ভুয়া প্যাড তৈরি করে তাতে দরপত্র তৈরি করে বিল হিসেবে দেখিয়ে পুরো ১ লাখ টাকাই আত্মসাত করেন প্রধান শিক্ষক মামুন। ১ লাখ টাকার বিল বলে যে কাগজ বিদ্যালয়ে জমা দেন সেটি মূলত কোনো বিল নয়- এটি একটি দোকানের দরপত্র, যাতে যন্ত্রপাতির তালিকা দেখিয়ে ১ লাখ ৩ হাজার টাকার দরপত্র।
এ বিষয়ে কথা হয় ‘মেসার্স শাহরিয়ারস’নামের ওই দোকান মালিক আনোয়ারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এ নামে আমার কোনো দোকান নাই। ট্রেড লাইসেন্সও নাই। আমি এযাবত কোনো প্রকার টেন্ডারে অংশ নেই নাই। সুতরাং কোনো বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগারের জন্য যন্ত্রপাতি সরবরাহের নামে বিল করে ১ লাখ টাকা উত্তোলনের প্রশ্নই ওঠে না। যে শিক্ষক এমন কাজ করেছে, সে শিক্ষক নামের কলংক।” তার নাম জড়িয়ে ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ আত্মাসের জন্য প্রধান শিক্ষক মামুনের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেন আনোয়ার।
এছাড়া বিদ্যালয়ের পুকুর লিজের ১,৫৫,০০০ টাকার মধ্যে ১ লাখ টাকা আত্নসাত করেছেন প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন।
একইসঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ২০২২-২৩ সালের বিদ্যালয়ের উপবৃত্তির ২,০১,৮৭০ টাকার পুরোটাই আত্মসাত করেন প্রধান শিক্ষক। বিল জমা দেওয়ার ১ বছর আগেই প্রধান শিক্ষকের অনুমোদন, সমিতির আন্দোলনের নামে ভুয়া বিল তৈরি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে টাকা উত্তোলন, প্রিন্টারের কালি, কম্পিউটার মেরামত, টেলিটক, এনটিআরসিএ, বুদ্ধিজীবি, বিজয় দিবস, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিবস, প্রভৃতির নামে সাদা কাগজে দাখিলকারীর নাম, ঠিকানা, স্বাক্ষরবিহীন ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে বিদ্যালয় তহবিল হতে মোট ৭, ৫৩,৪০১ টাকা আত্মসাত করেন প্রধান শিক্ষক মামুন। নিজেই ক্যাসিয়ার ও অনুমোদনকারীর দায়িত্বে থাকায় এসব বিল-ভাউচারের কোনোটিতেই বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদন নেওয়ার তোয়াক্কা করেননি আব্দুল্লা আল মামুন।
দুর্নিতীর আশ্রয় নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অসংখ্য ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে বিদ্যালয় তহবিল হতে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মামুন বলেন, “এইগুলার সব সত্য না। তবে ভুল ভ্রান্তি হতে পারে।”
দরপত্র দাখিল করে বিজ্ঞানাগারের জন্য যন্ত্রপাতি কেনার নামে ভুয়া দরপত্র দেখিয়ে ১ লাখ টাকার পুরোটাই আত্মসাতের বিষয়ে বলেন, “ওইটা ওইরকমই পাইছি। কিছু ভুল ভ্রান্তি হইতে পারে। সব অভিযোগের বিষয়ে অডিট পর্যালোচনা কমিটির আহবায়কের কাছে বলেছি বিষয়টা সমাধান করার জন্য।”
শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য বিদ্যালয় তহবিল থেকে টাকা নিতে পারেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক মামুন বলেন-“সব শিক্ষকরা গেছিলো তো, তাই এইটা করা হইছে।”
অন্যদিকে ক্যাসিয়ারের দায়িত্বে থাকাকালে প্রধান শিক্ষক মামুনের যোগসাজসে পুকুর লিজের ৫৫,০০০ টাকা আত্মসাত করেন সহযোগী শিক্ষক সুবীর চন্দ্র রায়। এছাড়া বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট তৈরি না করে ভুয়া বিল জমা দিয়ে টাকা উত্তোলনসহ বিদ্যালয়ের বাইরে ব্যক্তিগত দাওয়াত, ব্যক্তিগত মারামারির ঘটনায় এলাকায় মাইকিং ও মিডিয়ায় প্রচার করতে বিদ্যালয় থেকে টাকা উত্তোলন, শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে অংশ নেওয়া, শিক্ষকদের বেতন দেওয়া, বিল জমার ১ মাস আগেই অনুমোদন দেখানোসহ ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে ২,৭৮,০৩৪ টাকা আত্মসাত করেন সুবীর চন্দ্র রায়।
জানতে চাইলে সুবীর চন্দ্র রায় বলেন, “আমি তো টাকা নেই নাই। আমি যতদিন ক্যাসিয়ারের দায়িত্বে ছিলাম আমি শুধু বিল ভাউচারের টাকা দিছি। কিছু হয়তো এদিক সেদিক আছে। প্রমাণ হইলে সেইগুলা আমি দিয়া দিব।”
এছাড়া প্রধান শিক্ষক মামুনের যোগসাজসে করণিক জহিরুল ইসলাম বিদ্যালয়ের ভুয়া সনদ ও প্রসংশাপত্র তৈরি করে ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে বিক্রি করে লাখ টাকা আত্মসাত করেছেন বলে প্রমাণ মিলেছে।
এবিষয়ে টেলিফোনে জহিরুল এই প্রতিবেদকের সঙ্গে স্বাক্ষাতে কথা বলতে চান এবং অনৈতিক প্রস্তাব দেন। এর আগে, প্রধান শিক্ষক মামুন, সুবীর চন্দ্র রায় ও জহিরুলের দুর্নিতী নিয়ে অভিভাবক ও এলাকাবাসীর এক সভায় জহিরুলসহ অভিযুক্তরা তাদের অপরাধ স্বীকার করেন।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির ততকালীন সভাপতি এস এম নূরুল আলম রেজভী বলেন, “বিষয়টি আমি জানি। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পর অভিভবাক এলাকাবাসীকে নিয়ে গঠিত অডিট ও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তাদের দুর্নীতি প্রমাণ হয়েছে। তারা টাকা পরিশোধ করার কথা বললেও তা পরিশোধ করেননি। এসব ভুয়া বিল ভাউচারের কোনোটিতেই আমার কমিটির অনুমোদন নেওয়া হয়নি। আমি দায়িত্বে থাকাকালে, ২০২২-২৩ সালে শিক্ষকদের বকেয়া বেতন ২,৫২,০০০ টাকা আমি নিজের পকেট থেকে পরিশোধ করেছি। আর এখন শিক্ষকদের ১১ মাসের বেতন বকেয়া আছে বলে শুনেছি। অথচ তারা ১১ লাখ টাকার মতো আত্মসাত করেছেন। দুর্নীতির সাথে জড়িত সবার উপযুক্ত বিচার হওয়া উচিত।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইল সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শাহীন মিয়া বলেন, “আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এখন জানলাম। এবিষয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট হলে বা কেউ আমার কাছে অভিযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেব।”
উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে এলাকায় সুবীর চন্দ্র রায়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত মারামারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মদদে মানবন্ধন থেকে বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে নের্তৃত্ব দেন প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন। এঘটনায় মামুন ও সুবীরের বিরুদ্ধে বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে একটি মামলা আদালতে বিচারাধীন আছে।

